মাওলানা সাদ সাব (দাঃবাঃ) এর বিশেষ মোজাকারা ২০১২

মেরে মোহতারাম দোস্ত

আল্লাহ তায়ালা নিজ দয়ায়, করমে আমাদেরকে এ বড়, উচুঁ আমানতের বাহক বানিয়েছেন এবং এটা নির্বাচন না বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আমরা যেন এটাকে নির্বাচন মনে না করি যে, আল্রাহ তায়ালা আমাদেরকে এই আমানতের জন্য নির্বাচন করেছেন। বরং আমাদের জন্য এটা একটা পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তাকে নির্বাচন করা হবে।

এমন না যে কাজ করনেওয়ালা নির্বাচিত। বরং যে কাজ করছে সে তো পরীক্ষার সম্মুক্ষীন আল্রাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তায়ালা তাকে পরীক্ষার পর নির্বাচন করবেন যে, সে কাজের যোগ্য কিনা? অনেকে এ পরীক্ষায় ফেল হয়ে যায়। সুতরাং এ জিম্মাদারী বাহক বা উঠানেওয়ালারা সব সময় আল্লাহ পাকের কাছে নিজেকে কবুল করানোর ফিকিরে এবং কবুলিয়াতের শর্ত পূরণের ফিকরে মশগুল থাকাই বাঞ্জনীয়। এ জন্য খুব চিন্ত-ফিকির করি, আল্লাহর কাছে এ কাজের কবুলিয়াতের জন্য কি কি আসবাব রয়েছে? আল্লাহর কাছে কি কি আসবাব আছে এ কাজ থেকে সরে যাওয়ার? অর্থাৎ এমন আসবাব যার দ্বারা ভালো, পুরানো কাজ করনেওয়ালা বিতাড়িত হয় যায়? এটা বলা যায় না যে অমুক ব্যাক্তি বেশি কবুল এবং বেশি আগে বেড়ে আছে; সে আর ফিরবে না বা বঞ্চিত হবে না বা বিতাড়িত হবে না ।

ওহির কাতেব বা লেখক, যে হুজুর (ছা:) এর উপর ওহির নুযুল দেখতেন, অপেক্ষা করতেন, কখন হুজুর (ছ) এর উপর ওহি নাযেল হওয়া শেষ হবে, আর সাথে সাথে লিখবে।  কুরআন নাযিল হতেছেন দেখেছেন। এমন কাতেবে ওহিও যদি পরীক্ষায় ফেল হতে পারে, তবে তার চেয়ে বড় ওপরে আরো ভালো মর্তবা হতে পারে না, একিন করার জন্য যে ওহি নাযিল হওয়া দেখেছেন।

একবার ওহি নাযেল হওয়ার পর হুজুর (দ:) ঐ সাহাবীকে বললেন, লিখ, ওদিকে আল্লাহপাক এ মজমুন বা বিষয় ওহির ন্যায় ঐ সাহাবীর দিলে ঢেলে দিলেন। ঐ সাহাবী বললেন, “ ফাতা বা-রাকাল্লাহু আহছানুল খা লেকিন” আল্লাহ কত সুন্দর সৃষ্টিকারী ।

হুজুর (দ:) এটাও লেখ। কারণ, এটা তার অন্তরে এসেছে, ওদিকে এটা ওহি হিসেবেও এসেছে। এত বড় নৈকট্য আর মর্যাদা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও মুরতাদ হয়ে ইসলাম থেকে বের হ্‌ওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হুজুর (দ:) বললেন তাকে যেখানে পাও সেখানে হত্যা করে ফেল। যদি তাকে বাইতুল্লাহর পর্দা ধরা অবস্থায়ও পাও তবেও তাকে কতল করে দাও। অথচ সে কাতিবে ওহি ছিল। হুজুর (দ:) এর উপর ওহি নাযিল হতে দেখেছে।

বলার উদ্দেশ্য হলে আমাদের মধ্য হতে প্রত্যেকে ভয় হওয়া উচিৎ যে, আল্লাহর কাছে যোগ্যতা কবুলিয়াতের কোন বুনিয়াদ নয়। আল্লাহ তায়ালার কাছে আমল হলো কবুলিয়াত; তার জন্য শর্ত হচ্ছে সিফাত বা গুনাবলী। এ জন্য নিজেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে কবুল করানোর শর্তাবলীর উপর চিন্তা করো। মনোযোগ দাও যে, আল্লাহ তায়ালা কাছে কবুলিয়াতের কি শর্ত ?

১ম শর্ত হলো, এ রাস্তায় অপছন্দীয় হালতের উপর ধৈর্য ধারণ করা। এটা নবীদের গুন, নবীদের ইজতেমায়ী সিফত। কেননা এ রাস্তার অপছন্দ অবস্থার উপর সবর করা তরবিয়তের ছবব বা মাধ্যম। কতক্ষণ সবর করব? একটা প্রশ্ন আসে প্রত্যেক সাথীর দিলে।

হুজুর (দ:) মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। আবুযর (রা:) মসজিদে শুয়ে ছিলেন। হুজুর (দ:) তাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন। তিনি উঠলেন। হুজুর (দ:) জিজ্ঞেস করলেন, মসজিদে শুয়ে আছ? তিনি আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (দ:), আমার কোনো ঘর নেই,আমি মসজিদে ঘুমাই। হুজুর (দ:) বললেন (তুমি আমাকে এটা বল), আমার পর মদিনার উমারা বা জিম্মাদাররা যদি তোমাকে বিরক্ত করে বা কষ্ট দেয় তুমি তখন কি করবে?

আবু যার (রা) বললেন, আমি আবার শাম দেশে চলে যাব এব্ং সেখানে ঘর বানিয়ে থাকব। কেননা শাম দেশ নবীদের এলাকা।

হুজুর (দ:) বললেন, মুলকে শামের উমারা বা জিম্মাদারা যখন তোমাকে বিরক্ত করবে বা কষ্ট দিবে তখন তুমি কি করবে? বারবার প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে চাচ্ছিলেন – আমার সাহাবদের মধ্যে সবরের যোগ্যতা কতটুকু? কতক্ষণ সবরের জন্য তৈরি?

আবু যর (রা:) বললেন, আমি আবার মদিনায় ফিরে আসব এবং এখানে ঘর বনিয়ে থেকে যাব।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মদিনার জিম্মাদাররা তোমাকে যদি পুনরায় কষ্ট দেয় বা বিরক্ত করে তখন কি করবে?

আবু যর (রা:) বললেন, আমি তাদের মোকাবিলা করব।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু যর, ক্ষমা করতে থেকো যে পর্যন্ত কেয়ামতে আমার সাথে সাক্ষাত না হবে।

মেরে মোহতারম দোস্ত, তরবিয়ত ও তরক্কির জন্য সবচেয়ে বড় মাধ্যম এ রাস্তায় সবর। যার অন্তরে প্রতিশোধের জযবা থাকবে সে নবীওয়ালা মেহনতের রাস্তায় চলতে পারবে না। কেননা, প্রতিশোধের জযবা আর উম্মতের তরবিয়তের জযবা এক অন্তরে জমা বা একত্রিত হতে পারে না। এই দুই জযবা এক দিলে কখনও জমা হতেই পারে না। কেননা, যারা উম্মতের তরবিয়ত, হেদায়েত ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক চাইবেন তারা এ চাহিদার কারনে সব কষ্টকে বরদাশ্‌ত করবেন, সহ্য করবেন। এ জন্যই প্রতিশোধ ও হেদায়েতের জযবা এক দিল জমা হতে পারে না। যদি কারো দিলে প্রতিশোধের জযবা পয়দা হয়, তাহল বুঝে নাও যে, সে এ কাজের জযবা থেকে দুরে সরে গেছে, এ কাজের জযবা থেকে তার দিল খালি হয়ে গেছে। যদি কখনও, কোনো নবীর দিলে মানবিক কারণে প্রতিশোধের খেয়ালও এসেছে, সাথে সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাম্বিহ বা সতর্ক করা হয়েছে।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কসম খেয়ে বলছি। হামযা (রা) এর হত্যার মোকাবেলায় আমি ৭০ জন কাফেরকে কতল করব। তেমনি কতল করব, যেমনি হামযা (রা) কে করা হয়েছে, যেভাবে মুছলা (হাত পা কাটা) করা হয়েছে, আমি ৭০ জন কাফের কে সেভাবে মুছালা করব। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাম্বিহ করা হলো, হে নবীজী! আপনি এটা কি করলেন? যদি আপনার বদল একান্ত নিতেই হয় কাফেরদের থেকে (আমি কাফেরদের কথা বলছি) নিজেদের মধ্যে বদলা নেয়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। যদি কাফেরদের থেকে বদলা নিতেই হয়, তাহলে এতটুকু করতে পারেন যতটুকু আপনার সাথে করা হয়েছে। আপনি এক হামযার প্রতিশোধে ১জন কাফেরকে কতল করতে পারেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কসমে কাফ্‌ফারা দিলেন, কসম ভাংলেন।

বুনিয়াদি কথা হলো, প্রতিশোধের সাথে এ কাজের কোন জোড়-মিল নেই, কেননা সবর ও ইন্তিকাম একত্র হতে পারে না। উম্মতের হেদায়েতর আগ্রহ ও প্রতিশোধে এক দিলে জমা হতে পারে না। এজন্য সব নবী ও সাহাবাদের ইজেতমায়ী সিফত সবর।

সবর আলামাতে নবুয়ত (নিদর্শন) এর একটি। আলামাত সিফত হতে উঁচু বা উপরের স্তরের। হয়রত জায়েদ ইবনে সানা হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে এই নিদর্শন তালাশ করলেন যে, তাঁর মধ্যে সবর কতুটুকু আছে? তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঋন (করজ) দিলেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ নিলেন। যার বিনিময়ে খোজুর পরিশোধ করবেন। সময় আসার ৩ দিন আগেই যায়েদ বিন সানা হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জামার গারীবান (কলার) চেপে ধরলেন এবং অত্যন্ত রুক্ষ ব্যবহার করলেন্। ঘটনাটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। হযত ওমর (রা) এর অবস্থা এর পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রকাশ পেল যে, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করলেই তাকে কতল করে দিবেন। কিন্তু হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজন্য বললেন, ওমর তুমি এটা কি করলে ? তোমার তো উচিৎ ছিল আমাকে বলতে ঋণ পরিশোধ করতে আর তাকে বলতে যেন সে তার পাওনা উত্তম পন্থায় চায়। তুমি তাকে হত্যার ধমক কেন দিলে? হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ওমর) যাও তাকে তার পাওনা দিয়ে দাও এবং তাকে তার পাওনার চেয়ে ২০ ছাঁ খেজুর অতিরিক্ত দিবে। এটা আমাদের জন্য শিক্ষা যে বাড়াবাড়ি করনেওলায়াদের সাথে অনুগ্রহ করবে। আমাদের এখানে মুকাফাত বা বাড়াবাড়ি সমান সমান নয় বরং এহছান।

কার উপর এহছান? এহছান করনেওয়ালার উপর?

শোন, ধ্যান দিয়ে শোন, এহছান করনেওয়ালার উপর এহছান তো এহছানের বদলা স্বরুপ। তার চেয়ে বেহায়া কে হবে যে এহছানের বদলা দেয় না? সে তো অত্যন্ত খারাপ মানুষ যে এহছানের বদলা দেয় না। আমাদের স্তর এই নয় যে, শুধু এহছানের বদলা দিব, এহছানের বদলা তো ঋন। আর ঋন তো পরিশোধ করতেই হবে।

যে তোমাদের সালাম দেয় বা হাদিয়া দেয় (উভয় তাফসিরই করেছেন ওলামার) তোমরা তার বদলায় তাকেও সালাম করো বা হাদিয়া দাও (তার চেয়েও উত্তম বা কমপক্ষে ততটুকু)।

প্রশ্ন এতুটুকু নয় অনুগ্রহকারীর উপর অনুগ্রহ; শুধ এতুটুকু দ্বারা ইজতেমায়িয়াত পয়দা হয় না। বরং এর দ্বারা তওলিয়া হয় অর্থাৎ অমুকে আমার পক্ষে, অমুকে অমুকের পক্ষে, এর সম্পর্ক আমার সাথে, ওর সম্পর্ক ওর সাথে এতটুকু হয়। ইজতেমায়িয়াত পয়দা হয় যে কষ্ট দেয় তার উপর এহছান ও অনুগ্রহ করার দ্বারা। আর এটা এহছানের উচুঁ স্তর। এহছান করনেওয়ালার উপর এহছান, এহছানের নিম্ন স্তর। নবুয়তের শান হলো, তিনি এহছান করতেন কষ্ট দাতার উপর। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জায়েদ ইবনে সানাকে নিয়ে যাও ওমর। তাকে তার পাওনা দিয়ে দাও এবং ২০ ছাঁ অতিরিক্ত দিবে। কম দিতে বলেন নি যে, সে আমার  সাথে বাড়াবাড়ি করেছে না? কারণ, আমাদের এখানে ধরপাকড় নেই। এটা তো রাজনীতির মেজাজ; যে আমার সাথে চলবে, তাকে চালাব আর যে বাড়াবাড়ি করবে তার থেকে প্রতিশোধ নেব। এটা রাজনীতির মেজাজ, দাওয়াতের মেজাজ নয়। দাওয়াতের মেজাজ হলো, বাড়াবাড়ি করনেওয়ালার উপর এহছান করা। যখন যায়েদ ইবেন সানা কে অতিরিক্ত ২০ ছাঁ দেয়া হলো তখন তিনি তা নিতে অস্বীকার করলেন। যে, আমার পাওনা তো পেয়েছি। অতিরিক্ত কেন দিচ্ছ? ওমর (রা) বললেন, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ২০ ছাঁ খোজুর অতিরিক্ত দিতে বলেছেন। কারণ আমি তোমাকে তলোয়ার দিয়ে ধমক দিয়েছি। তার প্রতিদান স্বরুপ। অর্থাৎ আমি ভুল করেছি। তোমাকে ভয় দেখিয়েছি। এ জন্য বেশি দিতে বলা হয়েছে।

হযরত ওমর (রা:) তাকে বললেন, তুমি ইহুদিদের বড় আলেম, তা সত্ত্বেও এ ব্যবহার কেন করলে নবীর সাথে?

যায়েদ ইবনে সানা বললেন, তিনি নবী, কিন্তু একটা নিদর্শন যা বাড়াবাড়ি করা ছাড়া পরীক্ষা করার নয়, তার পরীক্ষা করছিলাম। তাই এমনি করেছি। যাতে বুঝতে পারি, নিশ্চিত হই, তিনি আল্লাহ্‌র নবী। আর সেটা হলো সবরের পরীক্ষা। এ জন্য এটা বুনিয়াদি বিষয় যে, সবর সব নবীর ইজেতাময় গুন।

নবীর প্রতি এর নির্দেশ হয়েছে: নবীজি আপনি সবর করেন এবং আপনার সবর আল্লাহ্‌র জন্যই যেন হয়।

এমন নয় যে, আজ সবর করব, আর তার উপর ভিত্তি করে কোন প্রতিদান চাইব। সবর করনেওয়ালারা তো সে, যে দুনিয়াতে এর কোন প্রতিদান চায় না।

১ম বিষয় হলো সবর এবং কতক্ষন পর্য্‌ন্ত সবর ? মউত পর্যন্ত । হযরতজী রহ: বলতেন দায়ীর মউত হয় সবরের ময়দানে আর কাফেরের মউত হয় খাহেশের ময়দানে।

সবর করনেওয়ালার উপর হুকুম হলো ক্ষমা করে দিবে । কারন সবরের অর্থই হলো ক্ষমা করা। যে ক্ষমা করে না সে ধৈর্যশীল হতে পারে না।

এজন্যই হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যার রা: কে বলেছেন, আবু যার ক্ষমা করতে থাক। তেমনি হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, নবীজি আপনি ক্ষমা করতে থাকবেন্। কেননা এই গুনাবলী ইজতেমায়িয়াত বজায় রাখার জন্য।

আমাদের সবচেয়ে বড় খারাবী ও দুর্বলতা হলো, আমাদের ইজতেমায়িয়াত ভেংগে যাওয়া। এর এক মাত্র সবব (কারন) হলো, আমাদের মধ্যে দুশমনের প্রবেশ। যত রাজত্ব খতম হয়েছে তার পেছনেও কারণ এটাই ছিল। যে, প্রথমে আপোষে একের উপর অপরের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এটা বড় চাল্ বা যুদ্ধের উপকরন বা অস্র। যে, একের উপর অন্যের আস্থা নষ্ট করে দাও। এতে করে তাদের ইজতিমায়িয়াত নষ্ট হয়ে যাবে। আর যখন ইজতেমায়িয়াত নষ্ট হয়ে যাবে, তখন যতই নামাজ, তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদ, জিকির আযাকর করুক আল্লাহর সাহায্য পাবেনা, এটা পাকা কথা।

এজন্য হজরতজী বলতেন, তোমাদের নামাজ, তোমাদের জিকির, তোমাদের তেলাওয়াত, তোমাদের তাহাজ্জুদ আরশেও যদি পৌছেঁ যায় এবং তোমাদের দোয়াও যদি আরশে পৌঁছে যায়; তবুও আল্লাহর সাহায্য আসবে না যদি আপোষে ইজতিমায়িয়াত না হয়। আর ইজতিমায়িয়াতের সবচেয়ে বড় আসবাব হলো, সাথীদেরকে ক্ষমা করার নিজাম তৈরী করা । এ জন্য আল্লাহ তাআ’লা বলেন, “হে নবী আপনি ক্ষমা করুন তাদেরকে এবং আল্লাহর সাহায্য ইজতেমায়িয়াতের উপর।“ ইজতেমায়িয়াত বলে দিল এক হওয়াকে; আর দিল এক হওয়ার জন্য আস্থা পূর্বশর্ত। আমি তো বলি, যদি স্ত্রীর উপর থেকেও আস্থা উঠে যায়, তো সে দম্পতির ঐক্য খতম হয়ে যাবে। স্ত্রীর উপর আস্থা না থাকা সংসার ধ্বংস হওয়ার কারণ। তেমনি আমাদের আপোষের ইজতিমায়িয়াত ধ্বংশের আসবাব আস্থা খতম হয়ে যাওয়া।

আল্লাহর সাহায্য ইজতিমায়িয়াতের উপর। সব দুর্বলতা সত্ত্বেও যদি ঐক্য বা ইজতেমায়িয়াত বাকি থাকে তো আল্লাহর মদদ থাকবে । আর যদি উচুঁ দরজার আমলও হয় আর যদি ইজতিমায়িয়াত না থাকে তবে আল্লাহর সাহায্য থাকবে না।

কুরআন পাকে ইজতিমায়িয়াতের আছরাত (প্রভাবসমুহ) বলা হয়েছে এবং অনৈক্যের আছরাতও (প্রভাবসমুহও) বলা হয়েছে। কুর’আন পাকে যত মেছাল (উদাহরণ) বর্ণিত হয়েছে মুনাফিকদের, মু’মিনদের এসব উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে মু’মিনদের জন্য। যেমন, নেফাকের নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে এতে মুনাফিককে সম্মোধন করা হয় নি। বরং মু’মিনরাই সম্মোধিত অর্থাৎ মু’মিনদের খেতাব করে বলা হয়েছে। মানুষ মনে করে এটা মুনাফিকদের সাথে সম্পৃক্ত্। নেফাকের আয়াত আর নেফাকের নিদর্শন এর সম্পর্ক মু’মিনদের সাথে।

কুর’আনে ঘটনা বর্ননা করা হয়েছে, ঐক্যের ফায়দা অনৈক্যের লোকসান বলার জন্য। কুর’আনে ২টি মসজিদের আলোচনা করায়েছে। একটি হলো মসজিদে কুবা অপরটি হলো মসজিদে দ্বারার। উভয়টি বাহ্যত মসজিদ হলেও প্রত্যেকটির মাকসাদ আলাদা। অথচ মসজিদ বলাই হয় যে জায়গা আল্লাহকে সেজদা করার জন্য হয়।  মসজিদ কুরাওয়ালার পবিত্রতা খুব পছন্দ করতেন। আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেন, ঐ মসজিদ যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর, যার মধ্যে অনেক এমন লোক আছে যারা পবিত্রতা পছন্দ করেন্। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন না; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জানতেন যে, মসজিদে কুবায়ালারা ইস্তেনজায় পানিও ব্যবহার করতেন, ঢিলাও ব্যবহার করতেন। তাই আল্লাহ তা’য়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন কুর’আন পাকে: “আল্লাহ অনেক পবিত্রতা পছন্দকারীদের পছন্দ করেন।“

অন্য দিকে মসজিদ দ্বারার, সেখানে কিছু যুবক একত্রিত হয়ে ঈমানদারদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল। সেটাও মসজিদ। এমন নয় যে, মন্দির বা গির্জা বানিয়েছে। বরং মসজিদই বানিয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্য হলো, মোকাবেলা করার এবং মু’মিনদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করার। মসজিদে দ্বারারওয়ালাদের উদ্দেশ্য তাফরিক অর্থাত অ্নৈক্য সৃষ্টি করা। আর মসজিদে কুরাওয়ালাদের উদ্দেশ্য তাকওয়া। আল্লাহ তা’লা নবী (দ) কে নির্দেশ দিলেন, আপনি অবশ্যই মসজিদে কুবায় যাবেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সপ্তাহে কুবায় যেতেন। আর মসজিদে দ্বারার সম্পর্কে বললেন যে, নবীজি আপনি কখনও সেখানে যাবেন না। কুর’আনে বলা হয়েছে, মসজিদে দ্বারারওয়ালারা কসম খেয়ে বলবে: আমরা তে কাজ ঠিকই করতে চাই।  আমাদের উদ্দেশ্য ভালো ছাড়া কিছু নয়। মনোযোগ দিয়ে শোন, তারা কসম খেয়ে বলেছে। অথচ আল্লাহ তা’লা বলেছেন, এরা মিথ্যাবাদী। কারণ তারা বলেছে, আমরা ভালোর ইচ্ছাই পোষন করছি। কিন্তু তারা যদি ভালোরই ইচ্ছা করত তাহলে তো সাথী হয়ে কাজ করত; প্রতিদ্বন্দী হয়ে নয়। এজন্য আল্লাহ তা’লা বলেন, নবীজী, আপনি সেখানে কখনো যাবেন না ।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু নওজোয়ানদের হুকুম দিলেন, যাও, মসজিদে দ্বারার এ আগুন লাগিয়ে দাও। সুতরাং আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হলো। এর সাথে যারা ছিল তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। তারা বিক্ষিপ্ত হওয়ার পর ঐ জায়গা খালি পড়ে ছিল।

এক সাহাবী জায়েদ বিন আকিল (রা)। তার কোন ঘর বাড়ি ছিল না। তিনি হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তার প্রয়োজনের কথা করেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জায়েদ বিন আকিল (রা) কে বললেন, মসজিদে দ্বারার এর জাগয়াটি খালি পড়ে আছে। তুমি সেখানে ঘর বানিয়ে নাও। জায়েদ বিন আকিল (রা) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ তা’লা আপনাকে বলেছেন, আপনি সেখানে কদমও রাখবেন না। আর আমি সেখানে ঘর বানিয়ে থাকব? না , আমি এ জায়গা চাই না। অন্য একজন সাহাবী (রা) , তার কোন ঘর ছিল না। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ঐ জায়গায়  ঘর বানিয়ে নাও। তিনি বলেন, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলার কারনে সে জায়গাটি নিয়ে নিলাম। আমি সেখানে ঘর বানিয়ে নিলাম। কিন্তু যতদিন ঐ ঘরে ছিলাম ততদিন আমি নি:সন্তান ছিলাম। যেমন আল্লাহ তা’লা বলেন, যদি তোমাদের নিয়ত ফাছাদের হয় তবে এর প্রভাব তোমাদের সত্ত্বা পর্যন্ত নিহিত থাকবে না বরং তোমাদের সন্তান এবং তোমাদের ক্ষেতও হালাক বা ধ্বংশ করবে। ঐ সাহাবী বলেন, যতদিন আমি ঐ ঘরে ছিলাম ততদিন আমার কবতুর ডিম দেয় নি। ঘরে মুরগী তায়ের জন্য বসালাম, সে ডিম থেকেও বাচ্চা হলো না।

আমি বলেছিলাম যে, ঐক্যের কি ফল আর অনৈক্যের কি প্রভাব ?

প্রথম বিষয় হলো, আপোষের ইজ্‌তেমিয়াতকে সর্বাবস্থায় বাকি রাখতে হবে। না-গাওয়ারী বা অপছন্দনীয় হালত বরদাশ্‌ত করা এ রাস্তার হাকিকত। এ রাস্তায় অপছন্দনীয় অবস্থা তো আসবেই। এ জনই হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  হুকুম করা হয়েছে নম্রতার। সাথীদের সাথে নম্র ব্যবহার করেন। কেননা শুরা কোন দারোগা বা শুরা কোন শাষক নয়। বরং শুরা তো খাদেম। আমাদের এ কাজে ফয়সালার বুনিয়াদ ফাসয়াল হওয়া নয় বরং ফয়সালার বুনিয়াদ সাথীদের অন্তরকে মুতমাইন করা । শাসক শাসিতের লড়াই এই জন্য যে, হাকিম বা শাসক ফয়সালার বুনিয়াদ সে শাসক। আমরা তো খাদেম, শাসক নই।

খাদেম তার মাখদুমকে বলে, আমার রায় এ ভাবে হলো ভাল হয়। মাখদুম বলে, এভাবে করো, এভাবে করো। আমরা মাখদুম নই, আমরা খাদেম। সুরা খাদেম। কোনো গোত্রে শাসক সেই হয় যে, খাদেম হয়। এ জন্য প্রথম বিষয় হলো, নম্রতা অবলম্বন সাথীদের সাথে।

………… এ আয়াতে ৪টি বিষয় বলা হয়েছে।, যার প্রথমটি হলো নম্রতা। ২য় বিষয় হলো ক্ষমা করা। আমাদের এ কাজে ধরপাকড় নেই। যে, অমুককে ধর; অমুককে জিজ্ঞাসা করো; সে কেন এ রকম করেছে? অনেক সময় এর প্রয়োজন পড়ে; তরে এটা ইজতেমায়ী নয়; ইনফেরাদী ভাবে হতে হবে। যে, তার সাথে কার ভালো সম্পর্ক আছে? তাকে দিয়ে চেষ্ঠা করব। এমন না যে, আমাদের শুরা আছে্। শুরার সামনে তাকে উপস্থিত করতে হবে।

গলদি বা ভুল করনেওয়ালার ভুল লুকানো এবং তাকে মুতমাইন করা, এটা মেজাজে নবুয়ত।

আমাদের মেজাজ হলো পুলিশের মত যে, ভুলকরনেওয়ালাকে ভয় দেখাও, ভীত করো। না, এটা তরবীয়তের রাস্তা না। তরবীয়তের রাস্তা হলো, ভুল করনেওয়ালার ভূল দেখেও এমন হয়ে যাও, যেন দেখই নি।

হযরত ওমর রা: রাতে বের হয়েছেন। এক ঘরের দরজা খোলা ছিল। দেখলেন, এক ব্যক্তি শরাব পান করছে। সাথে হযরত আব্দুর রহমান ইব্‌নে আউফ রা: ছিলেন। তাকে বললেন, দেখ, ঐ ব্যক্তি কি করছে?

তিনি বললেন, আমীরুল মু’মিনীন! আপনি তো ঐ কাজ করলেন, যা কুর’আনে নিষিদ্ধ।

হযরত ওমর রা: বললেন, কি ভাবে?

তিনি বললেন, আপনি তাজাছ্ছুছ অর্থাৎ দোষ অন্বেষণ করলেন। যা কুর’আনে নিষেধ করা হয়েছে।

হযরত ওমর রা: জিজ্ঞাসা করলেন, এখন আমার এ গুনাহ কিভাবে খতম হবে?

তিনি বললেন, এ গুনাহের ক্ষমার রাস্তা হলো, আপনি এখান থেকে এমনভাবে সরে যান, যেন, আপনি কিছু দেখেন নি। আর ঐ ব্যক্তি বুঝতে না পারে যে, আপনি দেখেছেন। তাহলেই আপনার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।

আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করেন। আমাদের তবিয়ত তো এখন এমন হয়েছে (আমি আমার কথাই বলছি, আপনাদের কথা বলছি না) যে, গলদ বা ভূল করনেওয়ালাকে ভুল করা অবস্থায় ধরে ফেলি। যাদের এ মেজাজ  হয়, খোদার কসম তাদের দ্বারা উম্মতের তরবিয়ত কখনও হতে পারে না। তাজাছ্ছুছ বা দোষ তালাশ কুর’আনে নিষেধ করা হয়েছে। খোদার কসম, যেনা করনেওয়ালার তত বড় গুনাহ হয় না, যত বড় গুনাহ ঐ ব্যক্তি হয়, যে যেনার সংবাদ দেয় বা গোপনীয়তা উন্মোচন করে। যেনা করনেওয়ালা যদি তওবা করে নেয়, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু যে প্রকাশ করল, তার কোনো ক্ষমা নেই। কেননা, যেনার ক্ষমা আছে, গিবতের ক্ষমা নেই। শিরকের তওবা আছে, কিন্তু গিবতের তওবা নেই। এ জন্য হুকুম হলো, কাউকে ভুল করতে দেখলে এমন হয়ে যাও যেন তোমরা দেখোই নি। ধর-পাকড়, পিছে পরা, দোষ তালাশ এগুলো আমাদের এ কাজে নেই। বরং ভুলকে লুকাও। ভুল করনেওয়ালাকে মুতমাইন (অর্থাত তাকে আন্তরিকভাবে নিশ্চিত) করো।

এক মহিলা এলো হযরত ওমর রা: কাছে, কিছু বলার জন্য, কাছে এসে বসল। সে কিছু বলবে এমন সময় তার অজু ছুটে গেল অর্থাৎ বায়ু বের হলো।  মহিলাটি অত্যন্ত লজ্জায় পড়ে গেলেন। হযরত ওমর রা: বুঝে ফেললেন। তিনি বললেন, মা, তুমি একটু জোড়ে বলো, আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। মহিলাটি মুতমাইন হলেন যে, তাহলে ওমর রা: আমার বায়ু বের হওয়ার শব্দ শুনতে পায় নি। চিন্তার বিষয়।

এমন বলেন নি, তোমার মধ্যে কোন আদব নেই। উঠ এখান থেকে। এটা তরবিয়তের এলেম। এ জন্যই বলছি আমাদের এখানে কোন ধর পাকড় নেই। সহজ কাজ হলো, ভূল করনেওয়ালার জন্য এস্তেগফার করো। এর হুকুমও রয়েছে, ‘নবীজি আপনি তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য এস্তেগফার করুন।’

ভুল কার না হয় ? বড় বড় ভুল সাহাবদের থেকেও হয়েছে। তাদের ভুল থেকে ‌কিছু বিষয় সামনে এসেছে- কোন ভুল ক্ষমার যোগ্য ? কোনটা ক্ষমার অযোগ্য ? ক্ষমা কতক্ষণ করব ? ইত্যাদি ।

এক সাহাবী হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আমার গোলামকে কতবার ক্ষমা করব? হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন দিনে ৭০ বার ক্ষমা করো।

৭০ এর সংখ্যা হাদীসে আধিক্য বুঝানোর জন্য আসে। অর্থাৎ অসংখ্যবার ক্ষমা করবে, যার কোন সীমা নেই। এই যদি হয় গোলামের ক্ষমা; তাহলে সাথীর ক্ষমার ব্যাপারে কি ধারনা ? আল্লাহ ক্ষমা করলে তুমি কে বাধা দেয়ার? এজন্য একটি উসুলি বিষয় হলো সাথীর দ্বারা কোনো ভুল হলে তার গুনের প্রতি দৃষ্টি দাও, তার পূর্বের কোরবানী দেখ। যখন কুরানির প্রতি দৃষ্টি দিবে তখন তার ভুল অত্যন্ত হালকা মনে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় কমজোড়ি  হলো সাথীর কোনো ভুল দেখে তার কুরবানী ভুলে যাই। এ দ্বারা কামলা বা কামকরনেওয়ালা নষ্ট বা হাত ছাড়া হয়ে যায়।

আমাদের কাজে বরং গোটা শরিয়তে গুনাহের তাহকিক নেই। কারণ গুনাহ প্রমান করা উদ্দেশ্য নয়। তাহকিক করলে কোনো সময় হয়তো চুরি প্রমান হবে। কিন্তু আমরা তো চুরি প্রমান করতে চাই না। আমরা ব্যভিচার প্রমান করতে চাই না। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ।

এক সাহাবী মায়িজে আসলামী হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলেন। এসে বললেন, আমি যেনা করে ফেলেছি। নিজে এসে বললেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারা অন্য দিকে করে নিলেন। তিনি সেদিকে পুন:রায় বললেন। আজ আমাদের তো একটা শুনা সংবাদই যথেষ্ঠ। ব্যাস্‌ একটা খবর পেলেই হলো, অমুকে অমুক কাজ করছে (চুরি করেছে বা এটা করেছে, ওটা করেছে)। আর রক্ষা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়েছে একটি হাদিস। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান, এক ব্যক্তি এসে তোমাদের মধ্যে একটা কথা বলবে। আর সে কথা তোমাদের মধ্যে প্রচারিত হয়ে যাবে। সাথীরা বলবে, এ কথাটা কে বলেছে ? শ্রোতার বলবে, হাঁ, এমন এক ব্যক্তি বলেছে, যাকে দেখলে তো চিনব কিন্তু নাম জানি না। হাদিসে স্পষ্ট এসেছে যে, সে শয়তান ছিল। তোমাদের মধ্যে একটা কথা চালিয়ে গেল।

অনেক শক্ত আয়াত, যার অর্থ- যারা পছন্দ করে যে, মন্দের প্রসার ঘটে ঈমানদারদের মধ্যে তাদের জন্য শক্ত আজাব দুনিয়া ও আখেরাতে।

বলেছিলাম যে, আমাদের এ কাজে কারো ভুল হলে তাহকিক নেই। বরং তাওয়িল (ভালো রুপ দেয়া ) আছে; এর হুকুম আছে।

যেমন হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়িজে আসলামীর ব্যাপারে তাওয়িল করলেন। যখন সে বলল, আমি যেনা করে ফেলেছি; হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মনে হয় তুমি চুম্বন করেছে।

মায়িজ রা বললেন, না, আমি যেনা করেছি।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না তুমি মনে হয় স্পর্শ করেছ। তিনি বললেন, না, আমি যেনা করে ফেলেছি।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাওয়িল করেছেন, না, তুমি বোধ হয় একটু আলিঙ্গন করেছ বা হাত লাগিয়েছ।

তিনি বললেন, না, না, আমি যেনা করে ফেলেছি।

আজ আমাদের কি অবস্থা? আমরা চাই, প্রমানিত হোক আর নবুয়তের শান হলো প্রমানিত না হোক।

আরেকটি ঘটনা। উট চুরিতে একজনকে ধরে আনা হলো। চুরি সাব্যস্ত হলো। হযরত ওমর রা: বলছেন, তুমি বোধ হয় নিজের উট মনে করে রশি খুলেছিলে।

সে বলছে, না আমি অন্যেরটা বুঝেই খুলেছি।

হযরত ওমর রা: বললেন, জল্লাদকে ডাকো এবং হাত কাট।

জল্লাদ এলো, তেল গরম করা হলো। হযরত ওমর রা: বললেন, আমি আসছি, একটু অপেক্ষা করো। আমি আসা পর্যন্ত কিছু করো না। একটু পর হযরত ওমর রা: এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর ? কেন এসেছ? কি ব্যাপার? তুমি কি চুরি করেছ? এসব প্রশ্ন এমনভাবে করা হলো যে, তার সাথে আগে কোন কথাই হয় নি। সে বলল, না, আমি চুরি করি নি। হযরত ওমর রা: বললেন, যাও, চলে যাও।

লোকের বলল, আমিরুল মু’মিনীন, একটু আগে চুরি সাব্যস্ত হলো। আপনি হুকুম করলেন, তেল গরম করতে। এখন বললেন, চলে যাও। ছেড়ে দিতে। হযরত ওমর রা: বললেন, আমি তো স্বীকারোক্তির উপর হাত কাটতে বলেছি আর তার অস্বীকার করার উপর ছেড়ে দিয়েছি।

আমরা না জানি কোন রাজনীতিতে পড়েছি? তাজাছ্ছুছ করনেওয়ালার দ্বারা তো কখনো তরবিয়ত হতে পারে না । তরবিয়ত আল্লাহ ঐ সব ব্যক্তিদের দ্বারা করবেন যারা সাথীদের দোষ নিজ সন্তানের মতো (অর্থাৎ সন্তানদের দোষ যেভাবে লুকানো হয় সেভাবে) লুকাবে। এজন্য বলছি, ভুল হলে সাথীর কোরবানির প্রতি দৃষ্টি দাও।

এক জানাজা আনা হলো, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে। জানাজা রাখা হলো। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়াবেন। ওমর রা: এলেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাজার সামনে থেকে সরিয়ে দিলেন। যে, আপনি জানাজা পড়াবেন না। জানাজা মুসলমানেরই ছিল। কি ব্যাপার? ওমর রা: বললেন, লোকটি এত দুষ্ট, ফাসেক ছিল যে, তার জানাজায় আপনার দাঁড়ানো আমার পছন্দনীয় নয়। আমরা কেউ পড়িয়ে দিব। কিন্তু আপনি পড়াবেন না। চিন্তা করেন, লোকটি কত খারাপ হতে পারে যে, আল্লাহর নবীর জানাজার নামাজ পড়ানো ওমর রা: পছন্দ করছেন না। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনকে দিয়ে এলান করালেন, আপনাদের কেউ কি এ ব্যক্তিকে কোনো ভালো আমল করতে দেখেছেন? একজন বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ ব্যক্তি অমুক জায়গায় একরাত আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দিয়েছে।

হাদিছে আছে, আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ পাহারায়  জেগেছে সে চোখ জাহান্নামের আগুন দেখবে না। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওমর তুমি পেছনে যাও।  ‘এটা কাফেরের জানাজা না, মু’মিনের।‘ এতটুকু জিজ্ঞেস করত পার। কিন্তু কোন মুসলমানের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার হক নেই।

হযরত হাতেব ইবনে বালতায়া রা বদরী সাহাবী। তিনি এমন একটা ভূল করলেন যার চিন্তাই করা যায় না, সাহাবাদের থেকে। ঘটনা এজন্য বলছি যে, যখনই কোন সাথী ভুল করে তখন তার কোরবানীর প্রতি দৃষ্টি দাও। হযরত হাতেব ইবনে বালতায়া রা. থেকে ভুল এই হলো যে, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মক্কা মুকাররমার উপর হামলা করার ইচ্ছা, হাতেব ইবনে বালতায়া রা. কুফফারে মক্কাকে জানানোর ব্যবস্থা করেন। চিঠি দিয়ে জানানোর চেষ্টা করেন যে, হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় দল নিয়ে তোমাদর উপর হামলার প্রস্ত্তুতি নিচ্ছেন। আর এত বড় দল নিয়ে আসছেন যে, তোমাদেরকে স্রোতে ভাসিয়ে যাবে। এই ভুলটা এতবড় যে, এটা ইসলাম ও মুসলমান সবার জন্য ক্ষতিকর ছিল। চিঠি একজন মহিলাকে দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন। চিঠি প্রেরণ করতে মহিলা রওনা হতেই জিব্রাইল আ: হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এসে জানিয়ে দিলেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান ও মেকদাদ রা: কে পাঠালেন। যাও, ঐ মহিলাকে অমুক জায়গায় পাবে। তার থেকে চিঠিটা নিয়ে এসো। উনারা গেলেন। রাস্তায় একজন মহিলা পেলেন। তাকে বললেন, চিঠি দাও। মহিলা বলল, কিসের চিঠি? উনারা দুইজন বলল, চিঠি বের করো। চাপ দিতেই মহিলা চিঠি বের করে দিলো। তারা হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে চিঠি এনে দিলেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতেব ইবনে বালতায়া রা. কে বললেন, তমি এটা কি করলে? হাতেব ইবনে বালতায়া রা. বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার পরিবার- আত্নীয় মক্কায় আছে। আমি একা হিজরত করেছি। আমি কুফ্‌ফারে মক্কার উপর এই নিয়তে এহছান করছিলাম যে, তারা আমার পরিবার-আত্নীয়র উপর রহম করবে, এহছান করবে।

হযরত ওমর রা. বললেন, আমি তো একে কতল করে দিব।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না ওমর, তুমি জানো না, সে বদরী  সাহাবী? আর আল্লাহ তা’লা বদরী সাহাবী সম্পর্কে বলেছেন, তোমারা যা চাও করো, তোমাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।

চিন্তা করার বিষয়, কত বড় ভুল, অথচ হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওমর সে তো বদরী সাহাবী । আর বদরীদের আল্লাহ তা’লা  ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এজন্য বলছি, নিজ সাথীদের দুর্বলতার উপর, তার কোরানির প্রতি দৃষ্টি রাখ; তার খুবীর উপর নজর করো।  কম জোড়ির উপর নজর দিও না; চাই সাথী নতুন হোক বা পুরাতন হোক। হাদিসে বলা হয়েছে, তোমারা সবাই ভুল করনেওয়ালা। তাহলে কে ভুল করে না?  সবাই তো ভুল করে। বরং সবচেয়ে বড় ভুল করনেওয়ালা সে যে বলে, আমার কোনো ভুল নেই।

এই কাজ করনেওয়ালারা কোনো ফেরেশতা নয় যে, তার ভুল হবে না।  আর ভুলচুক করনেওয়ালারাই তো কাজ করবে।  এজন্য নিজ সাথীকে মুতামাদ (আস্থাভাজন) বানাও। যত ইত্তেহাম (অপবাদ) সত্য-মিথ্যা সব অনাস্থার কারণে।  এর ফায়দা তো এছাড়া আর কিছু নয় যে, শত্রু পক্ষের জন্য রাস্তা খুলে যাবে, ভিতরে ঢুকার।

মেরে দোস্ত,

হযরত ওমর রা. এর জামানায় এক মেয়ের যেনা হয়ে গেল। যেনার কারণে তার কুমারীত্ব শেষ হয়ে গেল। যখন ঐ মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব এলো তখন মেয়ের পক্ষ চিন্তা করল, আমাদের মেয়ের মধ্যে তো একটা দোষ আছে। যেহেতু বিবাহ একটা মোয়ামালা তাই ছেলে পক্ষকে জানিয়ে দেয়া দরকার। বিবাহ হলে হবে, না হলে যা হবার তাই হবে। তখন ঐ মেয়ের পক্ষ হযরত ওমর রা. কে এ ব্যাপারে জানার জন্য জিজ্ঞেস করল, আমরা কি ছেলে পক্ষকে মেয়ের কোনো দোষ থাকলে বলে দিব? হযরত ওমর রা. বললেন, তোমরা ঐ মেয়র বিবাহ এভাবে দাও যেভাবে এক কুমারী মেয়ের বিবাহ দিয়ে থাক। যদি তার দোষের কথা ছেলে পক্ষকে বলো, তা হলে এমন শাস্তি দিব যে, দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে সারা দেশের জন্য।

এটা আমাদের জন্য রাস্তা, নিজ চোখে দেখা বস্তুকেও অস্বীকার করো। নিজ মোয়াশারাকে পাক রাখ, অন্যের কমজোড়ি দেখ না । ভূলের ভালো ব্যাখ্যা কর। সাথীদের কম জোড়ী সত্ত্বেও তাদের থেকে কাজ নাও। কেটে দিও না। আমাদের এখানে কাটার প্রশ্নই আসে না। কারণ এ কাজ থেকে কেউ অব্যহতি পেতে পারে না। এ কাজে অবসর নেই। এ কাজে মা’যুর হতে পারে, কিন্তু মা’যুল হতে পারে না। অর্থাৎ ওজর থাকতে পারে কিন্তু অবসর নেই, অপসারন নেই। একজনের ওজর থাকতে পারে, কাজে জুড়তে পারে না, যেমন, অসুস্থ, বৃদ্ধ। কিন্তু কাউকে মা’যুল অর্থাৎ অপসারন করা নেই। কেননা, আমাদের এটা কোনো কোম্পানী নয়।

আমাদের এটা কোনো জামাতও নয়। হযরত ইলিয়াস রহ. বলতেন, জামাত শব্দটিই বিভেদ সৃষ্টি করে। যে, আমার অমুক জামাত, তোমার আরেক জামাত। না, আমাদের এ কাজ কোন জামাতের (দলের) নয়। এটা অমুক দল, এটা অমুক দল। আমাদের নাম তো উম্মত; উম্মতী হয়ে কাজ করো। সাথীদের উপর আস্থা রাখ। সাথীদের কম জোড়ী সত্ত্বেও তাদেরকে কাজে ব্যবহার করো।

ইজতেমায়িয়াতের জন্য আরেকটি হুকুম হলো, নিজ সাথীদের সাথে মাশোওয়ারা করো। সব কমজোড়ির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো মশওয়ারার কমজোড়ি (দুর্বলতা)। সব মতভেদ মশওয়ারার কম জোড়ির (দুর্বলতার) কারণে।

সাথীদের সাথে মশওয়ারা করো। মশওয়ারার চেয়ে উঁচু কোনো ইজতেমায়ী আমল নেই। কেননা, মশওয়ারা উম্মতকে নিয়ে চলার আমল। নবীকে হুকুম করা হয়েছে মশওয়ারা করার জন্য। অথচ হাদিসে এসেছে, হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মশওয়ারা প্রয়োজন নেই। কেননা, আল্লাহ এবং তার রসুল সা: মশওয়ারার উর্দ্ধে বা মশওয়ারার অমুখাপেক্ষী। কেননা আল্লাহ গায়েব জানেন আর নবী তো আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন, সুতরাং তাদের উভয়ের মশওয়ারার প্রয়োজন নেই। এরপরও নবীকে মশওয়ারার হুকুম করা হয়েছে।

দেখ, আমাদের ইজতেমায়িয়াত তখনই শেষ হয়, যখন উমুরসমুহ সাথীদের থেকে লুকানো হয়। লুকানো কেন হয়? এই জন্য যে জানলে অমুকে অমুকে বিরোধীতা করবে। তারা এদের লোক। তাই এদের থেকে লুকাও। ওদিকে তারাও পৃথক এক জামাত বানিয়ে নিল। এসো আমরা ভিন্ন রায়ওয়ালারা জমা হই। তখন দোড় পয়দা হবে।

এই জন্য মশওয়ারাকে ইজতিমায়িয়াতের উপর আনো। মশোয়ারার চেয়ে বড় কোনো ইজতিমায়ী কাজ নেই। এই জন্য আল্লাহ তা’লা কুর’আন পাকে মশোয়ারাকে নামাজে সাথে জুড়েছেন। কেননা, উভয় কাজ ইজতেমায়ী, নামাজ ও মাশওয়ারা। নামাজের চেয়ে বড় কোন রুকন নেই ইসলামে আর মশাওয়ারার চেয়ে বড় কোন আমল নেই দাওয়াতের কাজে। দাওয়াত ও ইবাদতের বড় বড় ২টি আমর সুরায়ে শুরার মধ্যে এসেছে। েখানে বলা হয়েছে- এবং আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।

এতে উদ্দেশ্য হলো, যধি মাশোয়ারা সহি হয় এবং যদি মাশোয়ারা অনুযায়ীই চলবে তবে সাথীদের যোগ্যতার সঠিক ব্যবহার হবে।

এ জন্য মশওয়ারাকে ইজতিমায়ি বানাও। ইজতেমায়ী এটা নয় যে, ৫ জন মিলে একটা সিদ্ধান্ত করে নিল, ৬ষ্ঠ কারো আর এর খবর নেই। আর এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা যে, যে বিষয়ে যে সংশ্লিষ্ট তার সাথে সেই বিষয়ে মশওয়ারা হবে। এমন নয় যে,  সব মশওয়ারা সবার সাথে করতে হবে। এটা একটা উসুলী কথা। আমি নিজ থেকে একথা বলছি না বরং আমি হযরতের কথা নকল করছি।

মাওলানা ইউসুফ সাহেব রহ: বলতেন, সব বিষয়ের সম্পর্ক সবার সাথে নয়। যে বিষয় আপনার সাথে সম্পর্কিত নয় সে বিষয়ের মশওয়ারা আপনার সাথে হবে না। সাথীদের থেকে রায় নেয়ার এহতেমাম করো। যে, মশওয়ারা ইজতেমায়ী আমল তাকে ইজতেমায়ী বানাও।

মশোয়ারা ইজতেমায়ী হওয়ার ২ শর্ত:

১. যতদুর সম্ভব নিজ তাকাযা কুরাবনি করে মশওয়ারাতে অংশ গ্রহণ করো; চাই যতই কষ্ট হোক না কেন। এক ব্যক্তির সাথে ইমাম সাহেবের ঝগড়া হলো কোনো ব্যাপারে। তাই বলে কি নামাজ ছেড়ে দিবে ? এটা কি  সম্ভব? ঝগড়া ঝগড়ার জায়গায়। তাই বলে তো নামাজ ছাড়া যাবে না। ঝগড়া ইমামের সাথে, নামাজের সাথে নয়। ঠিক তেমনি মাশওয়ারাওলাদের কারো সাথে বিতর্ক হলো তাই বলে কি মশাওয়ারা ছেড়ে দিব? আমার মসজিদ, আমার নামাজ তো আমাকে পড়তে হবে। এমন কি রুকু সেজদায় তাকে অনুসরণও করতে হবে। এমন না  যে, ঝগড়ার কারণে আমি পৃথক রুকু বা  সেজদা করব। তেমনি আমাদের মশওয়ারাওলাদের সাথে ঝগড়া হয়েছে বলে মাশওয়ারাও ছাড়া যাবে না, অনুসরণও ছাড়া যাবে না।

যদি আমার রায় মানা হয় তাহলে ইস্তেগফার করব আর যদি মানা না হয় তাহলো শোকর করব। সবর না, অনেকে বলে সবর করো। না এটা সবরের মাকাম না। একটা কথা মনে রাখবে, যে ব্যক্তি নিজ রায়ের উপর (না মানা হলে) সবর করবে সে পেরেশান হবে। কারণ এটাতো শোকরের মাকাম।

আমার রায় অনুযায়ী যদি ফয়সালা হতো তাহলে (এই জিম্মাদরী আমার উপর বর্তাবে) আমাকে জিজ্ঞাসা করা হতো (কেয়ামতে)।  কারণ, যত রায় দেয়া হয় খোদার কসম, ঐসব রায় আল্লাহর কাছে লিখা হয়। কুরা’আনে এসেছে, নিশ্চয়ই প্রত্যেকের কান, চোখ, অন্তর জিজ্ঞাসিত হবে। তখন বের হবে কার রায়ে নফছানিয়াত ছিল? কার রায়ে হাছাদ ছিল? কার রায়ে খায়েশ ছিল? কার রায়ে দাওয়াত ছিল? এটা পাক্কা কথা। এজন্য বলা হয়, মশওয়ারাতে বসার আগে আল্লাহর দিকে মতাওজ্জুহ হও। নিজ রায় দেয়ার আগে ভালো করে খেয়ার করো যে আমার রায়ে কোনো খাহেশ নেই তো? এ জন্য সব অবস্থাতে মশওয়ারাতে অংশ গ্রহণ করো। আমাদের মেহনতে ওয়াক আউট (walk  out) নেই, এটা তো রাজনীতির কাজ। যে, আমার কথা মানো, তাহলো আসব, নতুবা নয়। না আসলে তুমি ২ কাজ থেকে বঞ্চিত হবে। মনে করবে মশওয়ারাতে না জুড়লে কি হবে? মহল্লার কাজ করব, গাস্ত করব, নিজ মসজিদের মেহনতে জুড়ব, সমস্যা কি যদি আমি মশওয়ারায় না জুড়ি? না, এটা তো আম মানুয়ের জন্য , আমাদের জন্য হলো, যে, মশওয়ারা থেকে কেটে যাবে,  সে কাম থেকে সরে যাবে। এজন্য মাশওয়ারাকে ইজতেমায়ী বানাও। হযরত ওমর রা. এর যুগে একজনও যদি মশওয়ারাতে অনুপস্থিত থাতেন তবে ওমর রা. তার ঘরে যেতেন এবং জানতে চাইতেন যে, সে কেন মশওয়ারায়ে এলো না?

মাশওয়ারাকে ইজতেমায়ী বানানোর ২য় বিষয় হলো, সাথীদের থেকে রায় নাও। একা একা ফায়সালা করো না। যেখানেই একাকী ফায়সালা হবে সেখানেই এখতেলাফের সৃষ্টি হবে। সীরাত পড়লে এমনটিই দেখা যায়। যখনই ফায়সালা একা একা (উমুমী মশওয়ারা ছাড়া শুধু ফায়সালের ফয়ালায় হয়েছে) তখনই মত বিরোধ দেখা দিয়েছে। কোনো এক এলাকাওয়ালা, কোনো এক জেলাওয়ালা এসে জিজ্ঞেস করল বা জানতে চাইল, আজ-কাল (এখন) ফায়সাল কে? কেউ বলল অমুকে ফায়সাল। বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে, চল ফায়সালকে জিজ্ঞেস করে নেই। তারপর ফায়সালের কাছে গেল। ফায়সাল তখন তাদের বলতে হবে, অমুক সময় আমাদের মশওয়ারাওলা সাথীরাও থাকবেন তখন আসবেন। কুর’আনে এরকমই ইশারা পাওয়া যায়- হে ঈমানদাররা, আল্লাহ এবং তার রাসুলের অনুসরণ করো এবং তাদের, যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব প্রাপ্ত (জিম্মাদার)। যদি কোনো বিষয়ে মতভেদ (  ) সৃষ্টি হয় তাহলে বিষয়টি নিয়ে আল্লাহ ও তার রসুলের দিকে ফিরে চল (অর্থাৎ আল্লাহ এবং তার রাসুলের তরিকার উপর মশোয়ারাকে আনো) যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী হও, এটা তোআমাদের জন্য উত্তম এবং সুন্দর তাওয়িল।

জিজ্ঞেস করনেওয়ালা একা, ফায়সালা করনেওয়ালা একা; তখনই এখতেলাফ হবে। যখন নিজ জেলায় গিয়ে কাজ শুরু করবে তখন এখতেলাফ হবে।

মেরে মোহতারাম, আমার চাই যে, কাজ ফায়সালা দিয়ে চালাব  না। এই কাজ তো চলবে সাথীদের রায়ে। ইজতেমায়ী মাশওয়ারায় চলবে। মাশওয়ারাকে নামাযের  সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। ফয়সাল ইমাম এবং মামুর মুক্তাদি এর মতো যে, ইমাম ভুল করলে মুকতাদি মনে করিয়ে দিবে, লুকমা দিবে। হানাফী মাজাহাব মতে যদি কোন একজন নামাজের বাহির থেকে লুকমা দেয় আর ইমাম লোকমা নেয়, তাহলে সবার নামাজ শেষ। তরতিব হলো, নামাজে শরিক হয়ে লুকমা দাও, তোমার কথা শুনা হবে। আর বাহির থেকে হলে তোমার কথা সত্য হলেও শোনা হবে না। তেমনি কাজে শরিক হও, সব আমলে শরিক হও, তোমার কথা শোনা হবে।

তবুকের সময় সাহাবাদের সব খাদ্য শেষ হয়ে গেল। সাহাবাদের খুব ক্ষুধা দেখা দিল। এক সাহাবীর জযবা, সে উট জবেহ করে খাওয়াতে চাইল। এজন্য সে হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে অনুমতি চাইল। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলেন। যখন সে উট জবেহ করার জন্য গেলেন, তখন হযরত ওমর রা. বাধা দিলেন। সে বলল, আমি অনুমতি নিয়ে এসেছি। হুজুর দ: অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ওমর রা. তুবও জবেহ করতে দিলেন না, যে, তুমি একা একা কেন জিজ্ঞেস করেছ? আমাদেরকে সাথে রাখতে। চল এক সাথে গিয়ে জিজ্ঞেস করব। হযরত ওমর রা. হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনি কি করছেন? আমাদেরকে যদি কেউ বলে যে, কি করছেন?  তাহলে আমাদের বড় গোস্বা এসে যায়। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কি ব্যাপার? হযরত ওমর রা. বললেন, আপনি উট জবেহ করার এজাজত দিয়েছেন? , হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হ্যাঁ। হযরত ওমর রা. বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার রায় তো এমন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কথাই ঠিক। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ফয়সালা ফিরিয়ে নিলেন। হযরত ওমর রা. বললেন, আপনি বরকতের দোয়া করে দেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন। খাদ্যে এত বরকত হলো যে, সাহাবাদের জন্য খাদ্য উঠিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে গেল। সাহাবীদের ব্যাগ বস্তা ভরে গেল। এমন কি সাহাবারা জামার হাতা ভরে খাদ্য নিলেন। এ ঘটনা থেকে পাওয়া যায়, মাশওয়ারা এস্তেমায়ী না হলে এখতেলাফ  আর ইজতেমায়ি হলে বরকত।

নিজ রায়ের উপর এছরার করবে না।  যে রায় দিয়ে দিলো সে তার উপর এর দায়িত্ব পুরো করো দিলো। এখন আল্লাহর দিকে মুতাওজ্জহ হও। হক কথার উপরও এছরার (পিড়াপিড়ি) ঠিক নয়। হক কথার উপরও এছরার গলদ। যেমন হুদায়বিয়ার  সময় হযরত ওমর রা. এছরার করতে লাগলেন। যে, আমরা ওমরা করে যাব। ওমরার জযবা তো ভালো। তেমনই যারা এখতেলাফ করে তাদের জযবাও ভাল। এমন না যে, তারা গলদ কিছু চায়। ভালো জযবার কারণেই তো বিরোধিতা। কিন্তু হুকুম তার বিপরীত। আর এমনটা আল্লাহ তা’লা এজন্যই করেন যে, আল্লাহ তা’লা দেখতে চান এদের মধ্যে মানার যোগ্যতা কতটুকু তৈরী হয়েছে।

এক ব্যক্তি ব্যভিচারের অনুমতি চাচ্ছে। তাকে বলা হলো না, এটা হারাম, সে যেনা থেকে বিরত থাকল, সে নেকি পাবে। কারন হারাম থেকে বিরত থাকল। কিন্তু ওমর রা. ওমরা করতে চায়, যা বাইতুল্লাহ ছাড়া গোটা পৃথিবীতে কোথাও করার অবকাশ নেই। নামাজ, জাকাত, রোজা সারা দুনিয়ায় করা যেতে পারে। কিন্তু ওমরা এক বাইতুল্লাহ ছাড়া সম্ভব নয়। ওমর রা. এর জজ্‌বা ওমরা করব। কিন্তু হুকুম এলো, না । ওমরা করবে না। ফিরে যাও। এটা এজনই ঘটেছে যে, আল্লাহ দেখতে চান- এদের মধ্যে নবীর এতেয়াতের যোগ্যতা কতটুকু? এজন্যই ভালো জযবার বিপরীত হুকুম আসে। ওমর রা. এছরার করলেন যে, না, আমরা হকের উপর আছি, আমরা ওমরা করব। হযরত ওমর রা. বলেন, আমি সারা জীবন সদকা দিয়েছি, এস্তেগফার করছি, যে, কেন আমি সে দিন রায়ের উপর এছরার করছি? এটা বলেন নি যে, আমি হকের উপর ছিলাম। বরং তওবা করেছেন যে, হে আল্লাহ, আমার সে দিনের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। যে, কেন আমি রায়ের উপর এছরার করলাম? একটু ভাল করে চিন্তা করুন। সাথীরা ভালো জযবার কারণে এছরার করেন। না ভাই, নিজ রায় দিয়ে অবসর হয়ে যাও। যখনই কোন সাথী ও শুরার রায়ে এখতেলাফ বা মতভেদ সৃষ্টি হয় বা এখ্‌তেলাফ দেখা দেয়, তখন খোলাফায়ে রাশেদীনদের (প্রথম শুরাদের) দেখ। তারা তাদের সময় সাথীদের রায়র কি রকম এহতেরাম করতেন। গভীর ভাবে চিন্তা করবে।

এক রেওয়াতে আছে, হযরত ওমর ও হযরত ওসমান রা. এর মধ্যে মশওয়ার মধ্যে এমন এখতেলাফ হতে যে, যারা দেখতেন তারা ভাবতেন আজকের পর বোধ হয় এ দুজন আর একত্র হবে না। কিন্তু মজমা থেকে ওঠার পর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আগের চেয়েও ভালো হতো।

মশওয়ারাওয়ালাদের, শুরা হযরতদের আমি একটা কথা বলছি যে, যখন তাদের আপোষে কোনো বিষয়ে এখ্‌তেলাফ হয়ে যায়, তখন তারা একে অন্যের রায়কে এহতেরাম করবে, যেমন আবু বকর রা. ওমর রা. একে অন্যের রায়কে এহতেরাম করতেন। এটা অত্যন্ত জরুরী। যদি এমন না করা হয়, তাহলে খোদার কসম, দুশমন ঢুকে পড়বে। অর্থাৎ যতক্ষণ একে অন্যের রায়ের এহতেরাম করবে এবং শুরার মধ্যে কোনো ফাটল না ধরবে ততক্ষণ বহিরাগত দুশমন ভিতরে ঢুকতে পারবে না। মশওয়ারাই হলো ফেৎতা বা ছালাহ (সুসম্পর্ক) করার দরজা।

যদি মশওয়ারা ফেটে যায় অর্থাৎ এর উসুল নষ্ট হয়, তাহলে দরজা ফেটে যাবে অর্থাৎ দুশমনের প্রবেশের রাস্তা খুলবে। কাজ যাতে আমার আপনার মন মতো না হয় বরং কাজ সীরাত প্রদর্শিত রাস্তা অনুযায়ী হয়। যদি কাজ সীরাত (নবী সাহাবাদের জীবনে) থেকে সরে যায় তাহলে আর আল্লাহর সাহায্য থাকবে না।

দুই ব্যক্তি এসে হযরত আবু বকর রা. কে বললেন, এই অমুক জমিনটা আমাদেরকে দিয়ে দেন ( জমিনটা বেকার পড়ে আছে) । যদি আমাদের দেন, তাহলে আমরা মেহনত করে কৃষি কাজের উপোগী বানিয়ে নেব। ভালো কথা। সুতরাং হযরত আবু বকর রা. ঐ সময় উপস্থিত সাথীদের সাথে মশওয়ারা করে নিলেন। মশওয়ারা করে নিলেন কিন্তু অনুপস্থিতদের জন্য কোনো অবকাশ রাখলেন না।  উপস্থিতদের রায়ের উপর হযরত আবু বকর রা. তাদেরকে ঐ জমিন দিয়ে দিলেন। (চিন্তা করার বিষয় হলো, ফায়সালটি ২ম খলিফা আবু বকর রা)। শেষে এতটুকু বলে দিলেন, দলিল (কাগজ) তো পাক্কা করে দিলাম, তবে তোমরা ওমর রা. এর স্বাক্ষর নিয়ে তাকে স্বাক্ষী করে নিও। যাতে তার জেহনেও থাকে যে, এ জমিন তোমাদের দেয়া হয়েছে। উকিলের দায়িত্বে ছিলেন হযরত তালহা রা.। তারা কাগজ নিয়ে গেলেন হযরত ওমর রা. এর কাছে। যে, আমিরুল মুমিনি আবু বকর রা. এ কাগজ দিয়েছেন। আপনি দস্তখত করে দিন। হযরত ওমর রা. পড়েলেন, যেখানে জমিন দেয়ার কথা লিখা ছিল, ওমর রা. থু থু দিয়ে সে জায়গাটা মিটিয়ে দিলেন। এরপর কাগজটি ছিড়ে ফেললেন। (থুথু দিয়ে মিটালেন এ জন্য যে, যাতে পরে আবার কাগজ জোড়া দিয়ে জমিন না নিয়ে নেয়। আমাদের জমানায় যদি এ ঘটনা ঘটতে তাহলে তো কেয়ামত ঘটানো হতো। ) আর বললেন যে, যাও জমিন পারে না। এও বললেন যে, যদি তোমরা এ ঘটনার কারণে আমার বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য চাও তো সাহায্যও পাবে না। আর তোমরা আমার বিরুদ্ধে যা করতে চাও করতে পারো। তারা ফিরে ফিরে এলেন।

হযরত তালহা রা. আবু বকর রা. কে বললেন, আপনি আমির না ওমর? দেখ, এটা হলো আপোষের সুসম্পর্কের চিহ্ন। আবু বকর রা. বললেন, ‘আমির তো ওমরই’। অথচ আমির আবু বকর রা. নিজে। কিন্তু বুঝলেন যে, আমার সাথী আমার রায়ের সাথে এখতেলাফ হয়েছে। বললেন, আমীর তো ওমরই, তবে এতেয়াত আমার করবে। তালহা রা. দেখলেন একজনের কাছে এমারত (আমীরত্ব) অপরজনের এতেয়াত (অর্থাৎ তাকে মানতে হবে)। তাই চুপ হয়ে গেলেন। আর কোনো রাস্তা রইল না। আজ আমাদের সব এখতেলাফ ব্যক্তি সম্পর্কের কারণে।

এ জন্যে প্রথমে আপোষের ইজতেমায়িয়াতকে দেখ। এসব ঘটনা আমাদের জন্য রাস্তা বা রোড সাইন (যেমন রাস্তার বিলিন্ন জায়গায় লিখা থাকে, অমুক স্থান এদিকে, অমুক স্থান ঐদিকে)। এজন্য মশওয়ারাকে ইজতেমায়ী বানাও। রায়ের এহতেরামও করো। চাই রায় যতই ভুল রায় হোক না কেন? হযরত সোলায়মান আ. বিলকিছকে পত্র লিখলেন। কাফের, সূর্য পুজক বিলকিস সে পত্র পড়েই বলল, আমি কোন সিদ্ধান্ত নেব না, যতক্ষণ আমি আমার অন্যান্য সর্দারদের রায় না নিব। হজরতজী বলতেন, সে তো বাতিলের উপর থেকেও মশওয়ারা করেছে; আর আমরা হকের উপর থেকেও মশওয়ারা করি না। বাতিল তো বাতিলের উপর থেকে একত্র হচ্ছে মশওয়ারা দ্বারা। আর আমরা হকের উপর থেকেও বিক্ষিপ্ত হচ্ছি মশওয়ারা ছেড়ে চলার দ্বারা। এতে রানী বিলকিসের সর্দাররা বলল, আমরা তো শক্তিশালী যোদ্ধা, কিন্তু আপনি যা বলেন (তাই হবে)। এর দ্বারা বোঝা গেল, জিম্মাদার যখন রায় নিবে তখন সাথীরা তার উপরই জমবে। তার দিকেই ফিরবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, দুশমন প্রবেশের ২টি রাস্তা। এক রাস্তা হলো মালের, অন্যটি অনাস্থা সৃষ্টি করার মধ্যে। সবচাইতে বড় কারণ বা মাধ্যম মাল। আমাদের এ কাজের বুনিয়াদ মাল রদ করা অর্থাৎ প্রত্যাখ্যান করা। মাল প্রত্যাখ্যান করাও নবুওয়াতের চিহ্ন (পরিচয়)। বিলকিস হাদিয়া পাঠিয়ে পরীক্ষা করছেন যে, সুলায়মান আ. কি বাদশা না নবী?

সে যদি কবুল করে তাহলে বাদশা । আর যদি নবী হয় তাহলে ফেরৎ দিবে। হযরত সুলায়মান আ. হাদিয়া আসার আগেই জানলেন হাদিয়া কি আসছে? জানলেন যে, হাদিয়ার মধ্যে অন্যান্য জিনিসের সাথে একটা স্বর্ণের ইট আসছে। হযরত সুলায়মান আ. নিজ দরবারের পুরো ফ্লোর স্বর্ণের বানালেন। যাতে তার বুঝে যে, তারা তো স্বর্ণের এক ইট হাদিয়া এনেছে, অথচ সুলায়মান আ. এর গোটা দরবারই স্বর্ণের। এবং একটা স্বর্ণের ময়দান বানালেন। সেখানে গৃহপালিত পশু ছেড়ে দিলেন। গরু, ছাগল মহিষ সেখানে পেশাব করে, গোবর ছাড়ে। ঐ ময়দানের এক জায়গায় এক ইট পরিমাণ জায়গাও খালি রেকে দিলেন।

সবচেয়ে বড় হেকমত আছে মাল প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে। খোদার কসম বলছি, যারা মালের পেছনে পড়ে তাদের বিবেক-বুদ্ধির উপর পর্দা পড়ে যায়। মালওয়ালারা কাজ করনেওয়ালাদের কিনে নেয়। প্রসিদ্ধ কথা এটা। কোনো গোপন কথা নয়। মালওয়ালারা কাজের মধ্যে দখলদারী করে।

একটি ঘটনা মনে পড়ল। হযরত থানবী র. মসজিদের হাউজ বানাচ্ছীলেন। হযরত মিস্ত্রিকে দেখিয়ে দিলেন এভাবে এভাবে কাজ করো। হযরতের এক মুরিদ হযরতের সাথে খুব সম্পর্ক রাখতেন। তিনি হযরতকে বললেন, মসজিদের হাউজের কাজ চলছে, আমি একটু আর্থিক নুসরাতে অংশ গ্রহণ করতে চাই। প্রথমে হযরত না করলেন। বারবার পিড়াপিড়ি করায় রাজি হয়ে আর্থিক নুসরাত নিলেন।

দুপুরে খাওয়ার পর হযরত বিশ্রাম নিচ্ছিরেন। এমন সময় শুনছেন বাহির থেকে মিস্ত্রির কথার আওয়াজ আসছে। যে, হযরত তো এভাবে নয় এভাবে বলেছেন। অর্থাৎ টাকা দানকারী, কাজের কোনো একটা বিষয় নিজ থেকে বলছিল। হযরত থানবী রহ. বাহিরে এসে ঐ লোকটিকে তার টাকা হাতে দিয়ে বললেন, এক্ষুণি বিদায় হও। তুমি টাকা দিয়ে আমার কাজে দখলদারী শুরু করেছ? মালওয়ালারা কাজে দখলদারী করে।

এজন্য মালওয়ালাকে শরমিন্দা করো। যেমন হযরত সোলায়মান আ. করেছেন। যে, গোটা ময়দান গরু ছাগলের আস্তাবল স্বর্ণের বানিয়েছেন। যে, আনেওয়ালা, হাদিয়া দেনেওয়ালা যখন দেখবে, তখন শরমিন্দা হবে। যে, এত স্বর্ণ যার,  তাকে আর এক ইট কি দিব? বিলকিসের হাদিয়া নিয়ে যে, আসছে, সে ঐ জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে এক ইট পরিমান ফাকা রেখে ছিলেন। সে তার কাছ থেকে ইটটা দ্রুত ঐখানে রেখে দিলেন। আর ভাবতে ছিলেন যে, কেউ যদি আমাকে এটা হাতে দেখে, তবে ভাববে আমি এ জায়গা হতে এই ইট চুরি করেছি। তার চেয়ে জান বাচাই। সে তার সাথে আনা স্বর্ণের ইট ঐখানে ফেলে দিলো। এটা সোলায়মান আ. এর হেকমত।

আমাদের বুনিয়াদই হলো, মাল প্রত্যাখান করো। আর আল্লাহ তা’লা থেকে সরাসরি নেয়ার রাস্তার উপর আস। হযরতজী বলতেন, যার নজর মালওয়ালাদের দিকে গেল সে নিজের জন্য আল্লাহর থেকে নেয়ার দরজা বন্ধ করে দিলো।

সাথীদের মধ্যে এতেমাদ বা আস্থা বৃদ্ধি করো। যদি এমন কিছু হয়েও যায় তো সেটাকে সেখানেই শেষ করে দাও; বসে আপোষে ঠিক করে নাও। এমন না যে আমাকে কে কি করতে পারবে? না ভাই । আপনার তো কিছু হবে না; যা হবে তাতো কাজের ক্ষতি হবে। সাথীদের মুতমাইন করে। দেখ, ওমর রা. মিম্বরে বসে ছিলেন। এমন সময় হাছান বা হোছাইন রা. এসে বলল, আমার নানার মিম্বর থেকে নামো। সঙ্গে সঙ্গে আলী রা. বললেন, দেখ এ কথা এ বাচ্চা বলেছে; আমি তাকে বলাই নি। অর্থাৎ এমন মনে করো না যে, আমার ঘরে বোধ হয় এমন কোনো আলোচনা হয়েছে। আগে থেকেই পরিস্কার করে দিলেন। অথচ তারা দ্বীনের বড্ড পরিচ্ছন্ন ছিলেন।

এজন্য সাথীদের সম্পর্কে দিল ছাফ রাখ। সাথীদের আস্থাকে বাড়াও। নিজ সাথীদের ফাজায়েল অর্থাৎ সাথীর গনাগুন বা কৃতিত্ব বর্ণনা করো। আমরা সাথীর দুর্বলতা ও দোষ চর্চ্চায় লিপ্ত। অথচ মেজাজে নবুওত হলো সাথীর গুন বয়ান করা, অন্য সাথীর সামনে।

হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথীর ফাজায়েল সাথীর সামনে বলতেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখন তোমাদের সামনে দিয়ে একজন জান্নাতী মানুষ যাবে। ‌এভাবে তিন দিন পর্যন্ত  বললেন, একি ব্যক্তির (সা’দ রা) সম্পর্কে। তিন দিন পর আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. এসে সা’দ রা. কে বললেন, আমি আপনার ঘরে তিন দিন থাকতে চাই। (উদ্দেশ্য, তার আমল তাহাজ্জুদ, তেলোয়াত, দোয়া দেখার।) আমিও জান্নাতী হব।

হযরত আব্দুল্লাহ রা. বলেন, আমি তাকে একদিনও তাহাজ্জুদে উঠতে দেখলাম না। তিন দিন পর হযরত আবদুল্লাহ রা. সা’দ রা. কে বললেন, ভাই, আপনার তেমন কোনো আমল তো দেখলাম না। অথচ হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার সম্পর্কে জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছে। হযরত সা’দ রা. বললেন, ভাই, আমার মা’মুল সত্য, আপনি যা দেখেছেন। হ্যাঁ, তবে একটা বিষয় হলো যে, যদি আল্লাহ কোনো মুসলমানকে কোনো কল্যাণ দিয়ে দেন, তার ব্যাপারে আমার দিলো কোন হাছাদ নেই।

এ কাজ আপোষের সাহায্য দ্বারাই চলে। যখন আল্লাহ তা’লা কারো থেকে কোনো কাজ নেন, তখন সর্ব প্রথম সাথীদের তার উপর হাছাদ হয়। আর হাছাদ নেকিকে এমনভাবে ধ্বংস করে যেমন, আগুন লাকড়ি বা কাঠকে ধ্বংস করে। অথচ হাছাদ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ কাজ আল্লাহ তা’লার, আর তিনি তার কাজ যার থেকে চান নিবেন। আল্লাহ তা’লা বলেন, আল্লাহ ভালো জানেন কার মাধ্যমে তার পয়গাম পাঠাবেন।

অন্যত্র এসেছে, আল্লাহ নিজে নির্বাচন করেন মানুষ ও ফেরশতাদের মধ্যে থেকে তার কাজের জন্য।

সুতরাং হাছাদের কোন সুযোগ নেই। এজনই যখন কোনো নতুন সাথী আগে বাড়ে তখন পুরানোরা তার পা ধরে টান দেয়। যে, আমাদের উপস্থিতিতে কোথায় যাও? এরপর সাহায্যকারী না হয়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। কি বলব ভাই? শয়তান এটা আমাদের দিলে আনবেই আনবে যে, আমরা পুরানোরা থাকতে নুতনরা কিভাবে আগে বাড়বে? অথচ এটা একটা পাকা কথা যে, যারা কাজে লাগবে তাদের আমলের হিস্‌সা (অংশ) পূর্বের সবাই পাবে।

সাহাবাদের মেজাজ ছিল, কাউকে আগে বাড়তে দেখলে, নিজকে তার সাথে সাথী হিসেবে কাজে লাগাতেন। আমাদের একাজে সিনিয়র, জুনিয়র বলতে কিছু নেই। অমুককে আগে করো, অমুককে পিছে করো। না, ভাই, আগে পিছে স্বয়্ং আল্লাহ তা’লা করেন।

অনেক সময় আল্লাহ তা’লা নতুনদের থেকে এমন কাজ নিয়েছেন, যা পুরানদের থেকে নেন নি। একবার হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই ইয়েমানী তরবারিটি কে নিবে? ওমর রা. ঐ তরবারি নেয়ার জন্য দাঁড়ালেন। যিনি হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আত্নীয়, পুরাতন কুরাইশী। সব যোগ্যতা ছিল, কিন্তু তাকে দিলে না। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এই ইয়েমানী তরবারিটি কে নিবে? জুবায়ের রা. দাঁড়ালেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেও দিলেন না।  ৩য় বার বললেন, কে নিবে এ তররারিটি এবং এর হক আদায় করবে। এবার হযরত আবু দুজানা রা. দাঁড়ালেন। হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দিয়ে দিলেন। অথচ ওমর রা. এর যোগ্যতা অনেক। এমন কি তার সম্পর্কে হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাও বলেছেন যে, যদি আমার পর কেউ নবী হতো তাহলে ওমর হতো। হযরত আবু দুজানা রা. ঐ তরবারী নিয়ে জিহাদে অংশ নিলেন। হযরত জুরায়ের রা. তার পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। যে, ব্যাপার কি? আমাদের না দিয়ে তাকে কেন দিলেন? হযরত আবু দুজানা রা. বীরত্বের সাথে সে তরবারি দিয়ে কাফেরদের শিরচ্ছেদ করতে লাগলেন। এমন করেন নাই যে, আমরা মাশওয়ারাতে যাব না। কারণ, আমাদের দেয় নি। সীরাতে এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে।

এমন কি বড়দের উপস্থিতিতে ছোটদেরকে আমীর বানানোও হয়েছে। যাতে এতেয়াতের ইমাতেহান (পরীক্ষা)হয়ে যায়। যে, যদি তোমাদের আমীর এমনও হয় যে, তার মাথা শুকনা কিছমিছের মতে কালো হয় বা হাবশী গোলাম হয় তাও তার এতেয়াত করো। বড়দের মানা তো সহজ কিন্তু ছোটদেরকে মানা সহজ নয়। হযরত উসামাকে আমীর বানানো হলো। অথচ জামাতে বড়, পুরানো সাহাবারা ছিলেন। এমন কি তাকাজাও এলো আমীরের পরিবর্তন করার জন্য।

সাথী ছোট হোক, যেমন হোক তার থেকে কাজ নেয়া চাই। এটাই অর্থ ঐ হাদীসের। যেখানে বলা হয়েছে, লোকদের সাথে তার মর্যাদা অনুসারে ব্যবহার করো। সাথীদেরকে ব্যবহার করো তাদের যোগ্যতানুসারে।

আরেকটা জরুরি কথা হলো, কখনও মজলিসে বা মশওয়ারায় সাথীদের হাইছিয়াত বা ইজ্জত নষ্ট করবে না। অনেক সময় মনে করা হয় যে, মশওয়ারায় ধমক দিয়ে দিব তো এছলাহ হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ল। খুব ধ্যানের সাথে শোন। যে, হযরত ওমর রা. বসা ছিলেন নিজ কামরায়। খাদেম আসলামকে বললেন, তুমি দরজায় বস। কেউ যাতে ভিতরে না আসে। খাদেম দরজায় বসা ছিলেন। এমন সময় হযরত জুবায়ের রা. এলেন। হযরত জুবায়ের রা. ছিলেন অনেক মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী। যখন আসলাম রা. বলল, ভেতরে যেতে পারবেন না, তখন হযরত জুবায়ের রা. আসলাম রা. কে এক থাপ্পড় মারলেন। যে, তুমি একজন গোলাম হয়ে আমাকে বাধা দিচ্ছ? হযরত ওমর রা. শুনে ফেললেন। হযরত আসলাম রা. কে ডেকে জিঞ্জেস করলেন কি হয়েছে ? হযরত আসলাম রা. ঘটনা বললেন। হযরত ওমর রা. হযরত জুবায়ের রা. কে বললেন, জুবায়ের, মনে রেখো, যখন জঙ্গলের কোনো প্রানীকে আহত করা হয়, তখন অন্য প্রানীরা তাকে খেয়ে ফেলে।

অর্থাৎ যখন কোনো প্রাণীকে আহত করা হয়, সে তার হেফাজতের সীমানা থেকে ছিটকে পড়ে যায়। এখন অন্য সবল প্রাণীরা তাকে খেয়ে ফেলে। এ কথার উদ্দেশ্য হলো, যখন তোমরা সাথীদেরকে আহত করবে, সাথীকে প্রভাবহীন করে দিবে তখন বাহিরের লোকেরা তার উপর চেপে বসবে। আমাক কথা বুঝেছ?

এজন্য নিজ সাথীদের এহতেরাম করো মজমার সামনে। এটা রিয়া নয়, বরং এটাতে নিজ মুসলিম ভাই এর দিল খোশ করা। যদিও লোকে জানে যে, তাদের আপোষে সম্পর্ক এমন…..। মহব্বতকে প্রকাশ করো আর এখতেলাফকে লুকাও, যদিও এটা করতে ছলনার আশ্রয় নিতে হয়, তাকাল্লুফ করতে হয়।

সাথীর একরাম করো সাথীর সামনে, যদিও দিল না চায়। দিলে কাটা থাকে থাকুক। এটা কোনোভাবে মানুষের সমানে প্রকাশ পাওয়া না চাই। আমাদের মহব্বত মানুষ দেখুক, আমাদের এখতেলাফ নয়। নতুবা বাতিল প্রবেশ করবে।

নামাজে মিলে মিলে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। কেন? এ জন্য যে, শয়তান প্রবেশ করতে না পারে। তেমনি আমাদের মহব্বত মানুষ দেখবে এখতেলাফ নয়। নতুবা দুশমন বা বাতিল প্রবেশ করবে। এ হুকুম সব জায়গায় যে, আপোষে জোড় ও ইন্তেকাক (ঐক্য) হোক। যে, দুশমন অনুপ্রবেশ করতে না পারে।

সাথীদের আস্থা বাড়াও, তাওয়িল বানাও। সাথীদের ভুলের ভালো ব্যাখ্যা করো, যদিও সে ব্যাখ্যা মিথ্যা হোক না কেন। আমার তো খুব মন চায় যে, এমন করব।

যে মিথ্যা সাথীর দোষ লুকানোর জন্য এবং মহব্বত কায়েম করার জন্য বলা হয়, সে মিথ্যা তো প্রিয় বা কাম্য। যদি কখনও এমন কিছু হয়ে যায় তো আপোষে এমন মহব্বত বা ঐক্য প্রকাশ করো যে, লোকেরা ভাবে আমরা তো ভুল বূঝে ছিলাম।

আমি একবার সৌদি এয়ার লাইন্সে ওমরা’র উদ্দেশ্যে যাচ্চলাম। পথে এয়ার লাইন্সের কর্মীদের কার্যক্রম শুরু হলো; খাওয়া দাওয়া ইত্যাদির। তাদের (ক্রুদের) মধ্যে কোনো বিষয়ে আপোষে এখতেলাফ হলো। খুব শক্ত ঝগড়া হলো। একে অপরকে আরবীতে বলছিল। কিন্তু চেহারা দিয়ে কাউকে বুঝতে দিচ্ছিল না। আর সাথীরা সবাই তো আরবী জানেও না।

এরপর তারা তাদের নির্ধারিত জায়গায় ভিতরে গিয়ে খুব ঝগড়া করল। গালি গালাজ করল্ আমার সিট তাদের কাছাকাছি ছিল। আমি পুরো শুনতে ছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর যখন বের হলো, তখন একদম হাসি মুখে, মিলে মিশে; যে, বুঝাই মুশকিল ছিল তাদের মধ্যে একটু আগে কিছু হয়েছে।

আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? সে বলল, না, কিছু না। আমি বললাম আমি তো শুনলাম, ঝগড়া হলো, গালিগালাজ হলো। সে আমার হাত ধরে বলল, আপনি শুনেছেন? আমি বললাম, হাঁ। সে বলল, আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে কাউকে বলবেন না। চলতে গেলে এক আধটু হয়ে যায়। কিন্তু যদি লোকে জানে তাহলে আমাদের কোম্পানীর বদনাম হবে।

দেখ ভাই, এক কোম্পানীওয়ালা কোম্পানীর পরওয়া করছে। আর আমরা সবচেয়ে বড় কাজ করছি। আর আমরা পরওয়া করছি না, যে, আমরা কি করছি? মানুষ আমাদের তামশা দেখছে। আমরা কি করছি? জাহাজ কোম্পানী, যাদের উদ্দেশ্য পয়সা ছাড়া কিছু না, তার চিন্তা করছে যে, আমাদের বদ আখলাক মানুষ দেখলে, কোম্পানীর বদনাম হবে।

আর আমরা উম্মতের হেদায়েতের, তরবিয়তের মেহনত করছি আর কোনো কিছুর পরওয়া করছি না।

তখন ঐ ক্রু বলল, হ্যাঁ, একটু হয়েছে। তবে আমরা সেটাকে মিটিয়ে ফেলেছি।

মেরে মুহতারম দোস্ত, আল্লাহ তা’লার সত্ত্বা অমুখাপেক্ষী। তার কাজো অমুখাপেক্ষী, তার দ্বীনও অমুখাপেক্ষী। দ্বীনের মেহনত অমুখাপেক্ষী।

 

“তোমরা না কররে অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করাবে।“

কাজ তো তোমাদের উপর নির্ভরশীল নয়। প্রয়োজনে সরিয়ে দিবেন।  যে মাছ নদীতে বা পুকুরে মারা যায়, পানি সেটাকে উপরে ভাসিয়ে দেয়। যাতে ভিতরের বাকিদের হেফাজত হয়। তেমনি কাজের লোকসান বা ক্ষতি হলে আল্লাহ তা’লা তাকে বের করে দিবেন।

এ জন্য আমাদের দরখাস্ত হলো, যে করেই হোক আপোষে সম্পর্ক-মহব্বত এহতেরামের সাথে চলা আমাদের কাজ, যেমন হুজুর দ. সাহাবাদের ফাজায়েল বর্নণা করেছেন। যে, আনছাররা. এমন, মুহাজিররা এমন। ঐ জিনিসের দিকে দৃষ্টি দিয়ে আমাদের চলতে হবে।

 

(আবদুর রহমান ০১৮১৮৫৫৫৬৭৮)

 

 

This entry was posted in Bayanat, Muzakara. Bookmark the permalink.